1
1দেবযানী দত্ত, ধূমকেতু ডটকম: আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে গণিত অলিম্পিয়াড কী তা ছিল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে। কিছু কিছু মানুষ যারা গণিত সম্পর্কে অবগত হলেও কিন্তু এই দেশে সেই চর্চার সুযোগ ছিল না। স্কুলগুলতে ছিল না গণিত চর্চার ব্যবস্থা। যার জন্য আমাদের দেশের কেউ গণিত অলিম্পিয়াডে যেত না। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশ থেকেও এখন গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করছে। বাংলাদেশ যে এখন গণিত অলিম্পিয়াডে যাচ্ছে এর জন্য যে মানুষটির নাম না বললেই নয়, তিনি হলেন প্রফেসর মোহাম্মদ কায়কোবাদ। সালটা হল ১৯৯৪, যখন অধ্যাপক মোহাম্মদ জাফর ইকবাল দেশে ফিরেছেন। একদিন প্রফেসর কায়কোবাদ তার সাথে দেখা করতে গেলেন, নানা ধরনের আলোচনায় কায়কোবাদ বললেন, ‘বুঝলেন জাফর ভাই পৃথিবীর সব দেশের ছেলেমেয়েরা ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথ অলিম্পিয়াডে যায়, আমাদেরও যেতে হবে’। মূলত সেই ভাবনা থেকেই অলিম্পিয়াড নিয়ে ভাবনা শুরু হল।
গণিত অলিম্পিয়াড যাত্রার প্রথমদিক
যেকোনো কাজ শুরু করতে গেলে নানারকমের বাধা দেখা দেয়। যেহেতু এর আগে কখনও এরকম কিছু হয়নি তাই কাজটি গুছিয়ে আনতে বেশ সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন ছিল। গণিত অলিম্পিয়াডের প্রথম দিকের কথা বলতে গিয়ে প্রফেসর জাফর ইকবাল বলেন, “একটা দেশ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অলিম্পিয়াডে কীভাবে টিম পাঠাতে হয়; সেই টিম কীভাবে তৈরি করতে হয়; আমরা তার কিছুই জানতাম না। প্রথমের দিকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ দিয়ে চেষ্টা করা হল। সেই সময় ওই বিভাগের প্রফেসর গৌরাঙ্গ দেব রায় ছিল আমার বন্ধু, তাকে নিয়ে নানা জায়গায় চিঠিপত্র লেখা হল, যোগাযোগ করা হল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হল না। এভাবেই কেটে গেল বেশ কয়েকটি বছর। এরপর একদিন প্রফেসর কায়কোবাদ এবং আমি ভাবলাম, সত্যিকারের গণিত অলিম্পিয়াড যদি শুরু করতে নাও পারি এদেশের ছেলেমেয়েদের গণিতে উৎসাহী করতে শুরু করে দিলে কেমন হয়? আমরা ঠিক করলাম, কোন একটা পত্রিকাতে আমরা প্রতি সপ্তাহে পাঁচটা করে গণিতের সমস্যা দেব- ছেলেমেয়েরা সেগুলো করবে, গণিতকে ভালবাসবে। পরিকল্পনা করে আমরা আর দেরি করলাম না, দু’জনে মিলে তখন প্রথম আলোর অফিসে হাজির হয়ে সম্পাদক মতিউর রহমানকে বললাম, আপনারা পত্রিকায় বিনোদনের জন্য খেলাধুলার জন্য কতকিছু করেন! গণিতের জন্য একটা কিছু করবেন? সপ্তাহে একদিন পত্রিকার এক কোনায় ছোট্ট একটু জায়গা দিবেন, সেখানে আমরা পাঁচটা করে সমস্যা দেব, সেটাই হবে আমাদের গণিত অলিম্পিয়াড”।
ঠিক এভাবেই যাত্রা শুরু হল গণিত অলিম্পিয়াডের। প্রথম আলোর ‘নিউরনে অনুরণন’ পরিচালনা শুরু করলেন ড. মোহাম্মদ জাফর ইকবাল ও ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ স্যার। নিউরনে অনুরণনের প্রথম প্রকাশ হয় ২০০১ সালের ১৭ জুন। প্রকাশিত প্রথম সমস্যাটি ছিল এরকম – একজন লোক তার বাড়ি থেকে উত্তরদিকে দশ মাইল গিয়ে একটা ভাল্লুকের মুখে পড়ল। অনেক কষ্ট করে ভাল্লুকের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে প্রথমে দশ মাইল গিয়ে তার বাড়িতে ফিরে এলো। ভাল্লুকের গায়ের রঙ কি?
এখন মনে পড়ে যাচ্ছে মোহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার এর লেখা ‘আমি তপু’ বইটির কথা। গল্পের নায়ক তপু একটি গণিত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সেখানে মোট ১০টি প্রশ্ন থেকে তপু সব চেয়ে কঠিন অংকটি সমাধান করতে করতে বাকিগুলো আর করতে পারে না। কিন্তু সেই অংকটি ছিল সবচেয়ে বেশি নাম্বারের আর তপু প্রতিযোগিতায় হয়ে গেল চ্যাম্পিয়নদের চ্যাম্পিয়ন।
তো যাই হোক, ফিরে আসি গণিত অলিম্পিয়াডের ইতিহাস নিয়ে।
প্রথম অলিম্পিয়াডের আয়োজন
২০০৩ সালে দেশে প্রথম বারের মতো শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩১ জানুয়ারী ও ১ ফেব্রুয়ারী এই দুই দিনের জন্য গণিত অলিম্পিয়াড আয়োজন করা হয়। ১০৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫০ এর অধিক শিক্ষার্থী প্রথম বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়।
আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের যাত্রা
২০০৫ সালে প্রথম গণিত অলিম্পিয়াডে যায় বাংলাদেশ। সে বছর ২৫২ নাম্বারের মধ্যে বাংলাদেশ পায় মাত্র ৩। কিন্তু মোহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার ও কায়কোবাদ স্যারের প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালে এসে বাংলাদেশের মোট নাম্বার এসে পৌঁছেছে ৩ থেকে ১১৪ তে। এতবড় পার্থক্য একদিনে আসেনি। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ দলের পক্ষে প্রথম একটি সমস্যা সম্পূর্ণভাবে সমাধান করেন শহীদুল ইসলাম। ২০০৯ প্রথমবারের মতো আইএমওতে বাংলাদেশের পক্ষে সামিন রিয়াসাত এবং নাজিয়া চৌধুরী ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন। ২০১২ সালে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম রৌপ্য পদক অর্জন করেন ধনঞ্জয় বিশ্বাস। আর ২০১৮ সালে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণ পদক অর্জন করেন আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী।
প্রথমে ডিসেম্বরে গণিত অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হয় জেলা পর্যায়ে। সেখান থেকে নির্বাচিতদের নিয়ে জাতীয় উৎসবে আবার আরেকটি পর্বের মাধ্যমে বিজয়ী নির্বাচন করা হয়। বিজয়ীদের নিয়ে এরপরে তৈরি হয় জাতীয় ক্যাম্প। আবাসিক এই ক্যাম্পে টানা ৭-১০ দিন ধরে চলে গণিত অনুশীলন এবং ফ্যাসিলাটেটর হিসাবে থাকে পুরানো ক্যাম্পের সদস্যরা। আইএমও ক্যাম্পের ফলাফলের ভিত্তি করে গঠন করা হয় ছয় সদস্যবিশিষ্ট আইএমও।
এখানে মোট ৪টি ক্যাটাগরিতে অংশগ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা।
প্রাইমারি ক্যাটাগরিতেঃ তৃতীয় – পঞ্চম শ্রেণী
জুনিয়র ক্যাটাগরিতেঃ ষষ্ঠ – অষ্টম
সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতেঃ নবম – দশম
হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতেঃ একাদশ – দ্বাদশ
গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য প্রস্তুতি
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে হলে তোমাকেও তৈরি হতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের প্রস্তুতি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হবে।
অলিম্পিয়াডের সমস্যাগুলো মূলত চারটি অংশে থাকে, Algebra, Number Theory, Combinatorics, Geometry।
আমাদের দেশের শিক্ষা কারিকুলামের কারণে জ্যামিতিতে সাভাবিকভাবে দক্ষ হয়ে থাকে। তাই আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ভাল।
গণিত অলিম্পিয়াডের নিবন্ধন
গণিত অলিম্পিয়াডের ওয়েব সাইটে অনলাইন গণিত অলিম্পিয়াডের নিবন্ধন করতে হয়। অনলাইনে নিবন্ধনকৃত প্রত্যেককেই অনলাইন বাছাই পর্বে অংশগ্রহণ করতে হয়। বাছাই অলিম্পিয়াডে বিজয়ীদের নিয়ে আঞ্চলিক পর্ব আয়োজন করা হয় এবং বাছাই পর্ব থেকে কেবলমাত্র বিজয়ীরা আঞ্চলিক পর্বে অংশগ্রহণ করতে পারবে। আঞ্চলিক পর্বের বিজয়ীরা জাতীয় গণিত উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হিসেবে বিবেচিত হবে।