আন্তর্জাতিকজাতীয়সর্বশেষ

আসন্ন নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নেবে না

আসন্ন নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নেবে না

বর্ধিত সহযোগিতা ও অংশীদারির পথে অগ্রযাত্রা’ শীর্ষক ওই সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেন, আসন্ন নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নেবে না। আসন্ন নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ বেছে নেবে না। আমরা শুধু এমন একটি প্রক্রিয়ার প্রত্যাশা করি, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে—কে দেশ চালাবে।’

আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান শুধু নির্বাচনের দিন ভোটদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কার্যত এরই মধ্যে নির্বাচন শুরু হয়ে গেছে। সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য আবশ্যক হলো নাগরিকদের মত প্রকাশ, সাংবাদিকদের ভীতিহীন অনুসন্ধান এবং নাগরিক সমাজের ব্যাপক পরিসরে জনমত গঠনের সুযোগ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস গতকাল রবিবার ঢাকায় ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে এক সেমিনারে এ কথা বলেন।

আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশ বিদেশি পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানাবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন কয়েক মাস আগে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রদূত। পিটার ডি হাসের গতকাল বক্তব্য দেওয়ার সময় সেমিনারের প্রধান অতিথি হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন। রাষ্ট্রদূতের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আগামী নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানানোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তিনি মিয়ানমারের মুসলিম ও অন্য সংখ্যালঘুদের মানবনিরাপত্তা অবস্থাবিষয়ক জাতিসংঘ সাধারণ সম্মেলনের প্রস্তাবে সমর্থন ও প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসন রোহিঙ্গা নিপীড়নকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানান।

মন্ত্রী বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তিনি আশা করেন, এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং সব দেশের সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একত্রে কাজ করে যাবে।

এ মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে দেশটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য সুবিধা আমরা পেতে চাই। এই সুবিধা পেতে শ্রমমান উন্নয়নে কী করতে হবে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র জানালে আমরা বাস্তবায়ন করব। ’ বঙ্গবন্ধুর ঘাতক রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর দাবিও তিনি তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন মোড় নিচ্ছে

মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘গত ৫০ বছরে আমরা আমাদের সংস্কৃতি, জনগণ ও আমাদের অর্থনীতিকে সম্পৃক্ত করে একসঙ্গে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করেছি। আমাদের সম্পর্ককে বাংলাদেশ যত দ্রুত প্রসারিত ও গভীর করতে চাইবে, যুক্তরাষ্ট্রও তত দ্রুত এগিয়ে যেতে প্রস্তুত।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ করলে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পরিবর্তন আসবে। কারণটা সহজ, বাংলাদেশ বদলে গেছে। ’ রাষ্ট্রদূত তাঁর বক্তৃতায় বাংলাদেশের অগ্রগতির উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, সম্পর্ক বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংলাপও প্রসারিত হয়। আগামী সপ্তাহগুলোতে প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হবে।

সম্পর্ক বৃদ্ধির তিন খাত

নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক—এই তিনটিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বৃদ্ধির উপযুক্ত খাত হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত। তিনি নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি, যৌথ মহড়া ও অনুশীলন এবং ‘জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জিসোমিয়া)’ ও ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিং অ্যাগ্রিমেন্ট (আকসা)’ স্বাক্ষরে জোর দেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, জিসোমিয়ার আওতায় সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদানের মূলনীতি নির্ধারিত হবে। এই রূপরেখা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ‘অভীষ্ট ২০৩০’ অর্জনে অবদান রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির সহায়তায় বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হবে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, আকসার আওতায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় একে অন্যকে সহায়তা দিতে পারবে এবং বিমান, যানবাহন বা নৌযান কোনো সমস্যায় পড়লে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা খুচরা যন্ত্রাংশ ধার দিতে পারবে কিংবা শুধু জ্বালানি ও খাদ্য বিনিময়ে সক্ষম হবে। ২০২০ সালে বিস্ফোরণের পর বৈরুত বন্দরে জাহাজ আটকে পড়া অথবা বঙ্গোপসাগরে যৌথ মানবিক ত্রাণ কার্যক্রম চলাকালে নিরাপত্তা ও যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টিতে আকসার প্রভাব আছে।

বাংলাদেশ-চীন চুক্তি নিয়ে তুলনা

পিটার ডি হাস বলেন, জিসোমিয়া ও আকসা সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। এগুলো কারিগরি চুক্তি। এগুলো জোট বা সামরিক চুক্তির পর্যায়ভুক্ত নয় কিংবা এগুলো কোনো বিস্তৃত ও অস্পষ্ট প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিও নয়; যেমনটা ২০০২ সালে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছিল চীনের সঙ্গে।

হাস বলেন, ‘এগুলো কেবল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির উপাদান হিসেবে এবং আপনাদের নিজ প্রতিরক্ষা অভীষ্টকে এগিয়ে নিতে আপনাদের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তা করবে। এ ছাড়া এগুলো প্রচলিত বিষয়। ৭০টিরও বেশি দেশ আমাদের সঙ্গে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ’

ইন্টারনেট ব্যবহার সংক্রান্ত সম্ভাব্য আইন নিয়ে বার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার রোধে এ আইন সংস্কারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাম্প্রতিক প্রতিশ্রুতিকেও স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ‘মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বড় অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে সমান তালে প্রতিযোগিতা করবে। মেধাস্বত্ব অধিকার, সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা, মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবসা পরিবেশের মতো বিষয়গুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ যেভাবে ইন্টারনেট কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে সেটি বিদেশি বিনিয়োগ ও বিভিন্ন কম্পানির বাংলাদেশে ব্যবসা করার আগ্রহকেও প্রভাবিত করবে। ’

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, শ্রম অধিকার না থাকায় যেমন বাংলাদেশ জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হয়নি, ঠিক একই কারণে ডিএফসিও বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় অপারগ। ’ রাষ্ট্রদূত জানান, এই গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তর থেকে একজন পূর্ণকালীন অ্যাটাশেকে বাংলাদেশে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ—দুটিই আছে

এর আগে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিভিন্ন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক রোকসানা কিবরিয়া, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বক্তব্য দেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিমের সঞ্চালনায় উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, মানববিধ্বংসী অস্ত্র খোঁজার নামে ইরাকে মার্কিন বাহিনীর অভিযানের প্রসঙ্গ আসে। বিআইআইএসএস চেয়ারম্যান কাজী ইমতিয়াজ আহমেদ ও মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাকসুদুর রহমানও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *